তেঁতুল রেসিপি বনাম ঘি’য়ে ভাজা পোলাও

কামরুল ইসলাম রুমী : কওমি মাদ্রাসার স্বীকৃতি নিয়ে নানা মুনির নানা মত দেখছি গত কয়েকদিনে। বেশীরভাগের প্রশ্ন সরকার কওমি মাদ্রাসাকে কি উদ্দেশ্য স্বীকৃতি দিল? সরকারের দুইটা মোটিভ থাকতে পারে। এক. সামনে নির্বাচনে দল ভারী করা, দুই. কওমির বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে মূল দ্বারায় নিয়ে আসা। সরকারের উদ্দেশ্য যাই হোক না কেন, সিদ্ধান্তটা দেশের জন্য মঙ্গলজনক হয়েছে বলেই মনে করি। ঝড়ে বক মরলে ফকিরকে কেরামতির জন্য বাহবা নাই বা দিলেন। বকটাকে পচতে না দিয়ে রান্না করে খেতে তো দোষ নাই।

আরেক দল শফি’কে নিয়ে আছে। কেউ তেঁতুল হুজুর বলে তাচ্ছিল্য করছে, কেউ বলছে মুনাফিকের মত বিশ্বাসঘাতকতা করছে, কেউ বলছে আসলে শাপলা চত্তরের কাহিনী ভুয়া সেটা প্রমাণ হল, কেউ বলছে স্বার্থপর ইত্যাদি। আবার এমনও তো হতে পারে উনি দেশের লক্ষ লক্ষ কওমি শিক্ষার্থীর স্বার্থ রক্ষার্থে আপোসে এসছেন। আসলে আমরা কেউই জানিনা আসলে কিসের পরিপ্রেক্ষিতে উনি এটা করেছেন। আমাদের তো গায়েবী ক্ষমতা নাই। তবে উদ্দেশ্য যাই হোক, আবারো ঝড়ে বক মরলে ফায়দাটা আমাদের নেয়া উচিৎ।

কওমি ছাত্রদের স্কিল এবং নলেজ নিয়েও নানান কটাক্ষ দেখা যাচ্ছে। ধরুন কোন কোম্পানিতে একটা পদের জন্য মাস্টার্স পাশ চেয়ে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেয়া হল। তো সেখানে শুধু কওমিরা নিশ্চয় ইন্টারভিউ দিতে যাবে না। দেশের সব কারিকুলামের শিক্ষার্থীরা সেখানে অংশগ্রহণ করবে। এখন ইন্টারভিউ বোর্ড নিশ্চয় যাকে পছন্দ করবে তাকেই নিবে। কওমি স্টুডেন্টরা নিশ্চয় জোর করে চাকরিতে নিয়োগ নিয়ে নিবে না। তাই যাদের স্কিল আছে তারাই চান্স পাবে। (যদিও এখানে স্কিল নিয়ে অন্য কথা আছে আমার)

বয়সে অতটা পেকে না উঠলেও, আমি একটা বড় কোম্পানিতে মুটামোটি রকম পদে আছি। সে সুবাধে আমার ডিপার্টমেন্টে যখন লোক নিই ইন্টারভিউ বোর্ডে আমিও থাকি। সে এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। কি পাবলিক কি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, যারা ইন্টারভিউ দিতে আসে তাদের মান যে কতটা উচ্চ তা নিয়ে আর নাই বা বললাম। লোকজন বলে আমাদের দেশে নাকি লবিং ছাড়া চাকরি হয় না। আবার এটাও সত্যি যে, ভাল পদের জন্য যোগ্য প্রার্থীরও যথেষ্ট অভাব এদেশে। আমাদের একজন অডিট অফিসার দরকার ছিল। তিনবার ইন্টারভিউর আয়োজন করে একজন ভাল যোগ্য লোক পাওয়া যায় নাই। বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, তিনবারে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় শুধুমাত্র একজন ক্যান্ডিডেট অডিটের সংজ্ঞা বলতে পেরেছে। তাই কওমিকে আলাদা ভাবে অজ্ঞ হিসেবে জাহির করে লাভ নাই। আমাদের পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাই যেই লাউ সেই কদু। যারা ভাল করছে এসব তাদের ইন্ডিভিজুয়্যেল এক্সেলেন্সি।

একজনের লেখায় দেখালাম ১৬ বছর বয়সে নাকি দাউরা পাশ করে ইন্টারভিউ দিতে গেছে এমন একটা ট্রোল। ১৬/১৭ বছরে দাউরা পাশ করা যায় নাকি সে বিষয়ে আমার কোন ধারণা নাই। আর যদি করা যায়, সেটা নিয়ে আপনাদের তাচ্ছিল্য আপনাদের অজ্ঞতা। আপনি খবর নিয়ে দেখুন ১৬ বছরের কমে ইউরোপ অ্যামেরিকায় গ্রাজুয়েশন করার উদাহরণ ভুরিভুরি। আপনি ক্লাস সিক্সে উঠলে যদি নিজেকে যোগ্য মনে করেন তাহলে ও-লেভেল পরীক্ষা দিয়ে ফেলতে পারবেন।

আবার কওমিদের নিয়ে ঢালাওভাবে যে জঙ্গিবাদের অভিযোগ (যদিও সম্প্রতি আমরা দেশের প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির মাম্মি ড্যাডিদের জঙ্গিবাদে যুক্ত থাকার ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছি), তাদের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখলে আমাদের আগে জানা উচিৎ, বিচ্ছিন্নরাই বেশরভাগ সময় বিচ্ছিন্নতাবাদী হয়ে উঠে। একঘরে করে রাখলে দেশের প্রতি, সমাজের প্রতি তাদের ক্ষোভ বাড়বে। এতে জঙ্গি উৎপাদনেও সুবিধা হবে।

এখন এদের মূলধারায় গ্রহণ করে নিলে সমস্যা অনেকাংশে কমে যাবে। এটা বিশাল একটা সু্যোগ হিসেবে আমাদের দেখা উচিৎ। কোন একসময় তাদের সিলেবাসকে হয়তো চাকরি উপোযোগী করে গড়ে নেয়া যাবে। কারণ এদেশে জ্ঞান আর স্কিল মানে মনে করা হচ্ছে চাকরি করার দক্ষতা।

আহা আমরা ভাল কেরানি হয়েছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

%d bloggers like this: