ভয়াল ২৯ এপ্রিল : আজও আতঙ্কে শিউরে ওঠে মানুষ

সুজন কুমার বিশ্বাস : ম্যারি এন। এটি কোন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা বস্তুর নাম নয়। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল ঘূর্ণিঝড়ের কথা মনে পড়লে আজও আতঙ্কে শিউরে ওঠে মানুষ। আর এই আতঙ্কের নাম ‘ম্যারি এন’। এর আঘাতে মানুষ ও পশু-পাখির প্রাণহানি, ল-ভ- ঘরবাড়ি এবং ধ্বংস হয়েছিল প্রাকৃতিক সম্পদ। যা ছিল দুঃস্বপ্নের একটি কালোরাতের কাহিনী। এর দৃশ্য ছিল করুণ ও বীভৎস। এটি স্মরণকালের ভয়াবহ প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়। ‘ম্যারি এন’ নামক ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে প্রাণ হারায় এক লাখ ৩৮ হাজারেরও বেশি মানুষ। মৃত্যু হয় প্রায় ২০ লাখ গবাদি পশুর। সম্পদের ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা। আশ্রয়হারা হয়েছিল কয়েক হাজার পরিবার। কিন্তু বেসরকারি হিসেবে প্রাণহানি ও ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি। স্বজন ও সহায় সম্পদ হারিয়ে এখনও সেই দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে বেড়াচ্ছে কয়েক সহস্রাধিক মানুষ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বে প্রতি বছর গড়ে ৮০টি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়। এর বেশির ভাগই সমুদ্রে মিলিয়ে যায়। কিন্তু যে অল্পসংখ্যক উপকূলে আঘাত হানে তা অনেক সময় ভয়াবহ রূপধারণ করে। এর মধ্যে ‘ম্যারি এন’ অন্যতম। এর আঘাতটি শুধু বাংলাদেশ, ভারত কিংবা মায়ানমার নয় বরং গোটা বিশ্বব্যাপীর মাঝে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল।

সূত্র মতে, ঘূর্ণিঝড়টি চট্টগ্রাম এবং নোয়াখালী জেলাসহ দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় এলাকার উপর দিয়ে বয়ে যায়। তখন বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ২৫০ কিলোমিটার। ২০ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাসে তলিয়ে যায় বিস্তীর্ণ এলাকা। নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ৬০ লাখ মানুষ। ৬ লাখ ৪২ হাজার ৫২টি ঘর সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয় ৫৬ হাজার ২৭১টি ঘর। ধ্বংস হয়ে যায় ৫০টি সেতু ও কালভার্ট। ১১২ মাইল দীর্ঘ উপকূলীয় বাঁধ বিলীন হয়ে পড়ে। এ সময় চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরের মারাত্মক ক্ষতি হয়। বহু জাহাজ ল–ভ- হয়ে যায়। জাহাজের আঘাতে দ্বিখন্ডিত হয়ে পড়ে শাহ আমানত সেতু।

ঘূর্ণিঝড়টি আঘাত হানে চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায়। কিন্তু সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল সন্দ্বীপ, হাতিয়া, উড়ির চর, বাঁশখালী, কক্সবাজার, পতেঙ্গা, কুতুবদিয়া ও মহেশখালী উপকূলীয় এলাকার জনসাধারণ। এখনও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে অনেক মানুষ। ঘূর্ণিঝড়ে আতঙ্কিত জেলার ১০ লক্ষাধিক উপকূলবাসী। ১৯টি জেলার ৪৮টি উপজেলার ৭১০ কিলোমিটার এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে এক কোটি ২০ লাখেরও বেশি মানুষ। ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প ও সুনামির আতঙ্কে দিনযাপন করছে তারা।

সম্প্রতি কয়েক দফায় ভূমিকম্পে নাড়া দিয়ে গেছে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশ। প্রতি বছর ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ঘরবাড়ি, রাস্তা-ঘাটসহ কয়েক হাজার কোটি টাকা মূল্যের সম্পদের। প্রতিবছর কোথাও না কোথাও প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিচ্ছে। যেকোন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভূমিকম্পের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ পুরো বিশ্বের কাছে পরিচিত। সবকিছু মিলিয়ে আমাদের রেহায় পাওয়ার কথা নয়। প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবেলা করার মত বাংলাদেশের নেই তেমন উন্নত প্রযুক্তি। এ ধরনের ২৯ এপ্রিল কিংবা এর চেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি আবারও দেখা দিতে পারে। অসম্ভব কিংবা অবাস্তব কিছু নয়; বর্তমান সময়ে প্রকৃতির চেহারা দেখে তাই মনে হচ্ছে। সেজন্য সকলের সচেতন থাকতে হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিষয়ে বিভিন্ন সংগঠন কাজ করছে। তবে এ সংগঠনগুলো যদি আরো আন্তরিক হয় তাহলে সাধারণ মানুষ ক্ষতির সম্মুখীন হতে কিছুটা হলেও রেহায় পেতে পারে।

সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণে সরকার খুবই আন্তরিক। দেশে এখন প্রায় তিন হাজার ২০০টি সাইক্লোন শেল্টার রয়েছে। আরো পাঁচ হাজার ২০০ সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণের প্রক্রিয়া চলছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে যেসমস্ত সাইক্লোন শেল্টার আছে তা অযত্নে-অবহেলায় পড়ে রয়েছে। বিশাল জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করার নিমিত্তে সরকারকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় সচেতনতা বৃদ্ধি, বেড়িবাঁধ নির্মাণ, আশ্রয়কেন্দ্র সংস্কার ও বৃদ্ধিকরণসহ জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার। পাশাপাশি জনগণকে উক্ত সাইক্লোন শেল্টারগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে রাখতে হবে। যাতে করে দুর্যোগ পরিস্থিতিতে ভালোভাবে আশ্রয় নেয়া যায়।

লেখক : প্রাবন্ধিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

%d bloggers like this: