পাঁচ বছর ধরে নিখোঁজ জাহাঙ্গীর : সন্তান ফিরে আসার প্রহর গুনছেন মা

ইকবাল কবির, ঢাকা ব্যুরো প্রধান : পুরনো ঢাকার লালচাঁন মুকিম লেনের প্রায় ৭০ বছরের বৃদ্ধা রেনু বেগম মোটরবাইকের শব্দ পেলেই দৌঁড়ে ছুটে যান জানালায় এই বুঝি আমার নারী ছেড়া ধন প্রিয় সন্তান জাহাঙ্গীর ঘরে ফিরলো, কিন্তু না। এভাবেই গত পাঁচ বছর ধরেই সন্তানের ফিরে আসার প্রহর গুনছেন রেনু বেগম ও তার অপর সন্তানরা। কিন্তু জাহাঙ্গীর আর ফিরে আসছে না। আসছে নানা সংবাদ।

বলছিলাম ওয়ারী থানাধীন ৫০নং লালচান মুকিম লেনের বৃদ্ধা রেনু বেগমের কথা যার সন্তান নিখোঁজ রয়েছে গত ৫বছর ধরে। গত সপ্তাহে কথা হয় রেনু বেগম, তার তিন মেয়ে ও নিখোঁজ জাহাঙ্গীরের স্ত্রী ও সন্তানদের সঙ্গে। পরিবারের সবাই গত ৫ বছর ধরে ঘরে না ফেরা জাহাঙ্গীরের রহস্যময় নিখোঁজ থাকার সবিস্তারে বর্ণনা দেন।

২০১২ সালের ১৩ এপ্রিল রাত আনুমানিক ৮টায় আদালত পাড়ার জনসন রোডের হোটেল মীম এ খাবার খাওয়াকালীন সময় একদল সাদা পোশাকের লোক ডিবি পরিচয়ে জাহাঙ্গীরকে একটি সাদা মাইক্রোবাসে (যার গায়ে লোক প্রশাসন লেখা ও গাড়িতে “ফাতেমা ফুড” স্টিকার লাগানো ছিলো) তুলে নিয়ে যায়। পুরোনো ঢাকার দোলাইখালের মটরপাটর্স ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীরকে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে ধরে নিয়ে যাওয়ার সংবাদে তার ছোট ভাই আলমগীর, বোন তাসলীমা ও সাবিহা ভাই এর সন্ধানে খোঁজখবর করতে থাকেন। এরমধ্যে বাবুল নামে সিদ্দিকবাজারের এক ব্যক্তি জানান, জাহাঙ্গীর তাদের কাছে রয়েছে, ২০ হাজার টাকা দিলে তাকে ছেড়ে দেয়া হবে ০১৯১৬-১৫২৭২৭ এ নম্বর থেকে ফোন দিয়ে তিনি এ দাবি জানান। ২৭-০৪-২০১২ তারিখ বাবুলের কথা মতো সাদেক মজিবর নামে এক ব্যক্তিকে ২০ হাজার টাকা দেয়া হয়। কিন্তু জাহাঙ্গীরের কোন সন্ধান তারা দিতে পারেননি। এরপর নিজ ভাইকে ফিরে পেতে ভাই-বোনরা দীপক নামে আরেক ব্যক্তিকে ১০ হাজার টাকা প্রদান করেন কিন্তু সেও জাহাঙ্গীরের কোন সন্ধান দিতে পারেননি।গত ৫ বছরেও জাহাঙ্গীর আর ঘরে ফেরেনি।

এদিকে তার পরিবারের সদস্যরা জানান জাহাঙ্গীর নিখোজের ১৫দিন পর রাসেল নামে এক ছেলে তাদের বাসায় এসে জানান জাহাঙ্গীর একটি বাহিনীর কাছে আছে। তাকেও আটক করা হয়েছিলো, এক সঙ্গেই ছিলেন। জাহাঙ্গীর যদি সাগর-রুনী হত্যার দায় স্বীকার করে তবে তাকে আদালতে পাঠিয়ে দেয়া হবে। এরপর তার পরিবার ওই আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করেও জাহাঙ্গীরের কোন সন্ধান গত ৫ বছরেও করতে পারেননি।

পাঁচ বছর ধরে নিখোজ জাহাঙ্গীরের বৃদ্ধা মা রেনু বেগম বলেন, এখন চোখে আর পানিও আসেনা। ছেলের জন্য কান্না করতে করতে চোখের পানি শুকিয়ে ফেলেছি। আমার বুকের ধন বেঁচে আছে না মরে গেছে তাও জানিনা। তার দৃঢ় বিশ্বাস তার সন্তান বেঁচে আছে, একদিন তার কোলে ফিরে আসবেই।

রেনু বেগম বলেন, সন্তান মারা গেলেও একটা শান্তনা পাই। কিন্তু আমার ছেলেকে কি কোন বাহিনী গুম করলো, না কোন সন্ত্রাসী বাহিনী অপহরণ করলো সে কি বেঁচে আছে, না মরে গেছে গত পাঁচটি বছরে সরকারের কোন বাহিনী তদন্ত করে আমার সন্তানের খবরটি দিতে পারলো না।

তিনি বলেন যখনই আমার জাহাঙ্গীরের কথা মনে হয় তখনই আমার নাতি (জাহাঙ্গীরের ছেলে ও জাহাঙ্গীরের ছবি বুকে জড়িয়ে কান্না করে মনকে সান্তনা দিই।

এদিকে নিখোজ জাহাঙ্গীরের বোন তাসলীমা জানান গত পাঁচ বছরে থানা পুলিশ, ডিবি ও সর্বশেষ সিআইডি মামলাটি তদন্ত করে আজ পর্যন্ত তাদের কোন ভাল সংবাদ দিতে পারেননি। নিখোঁজ জাহাঙ্গীরের মা রেনু বেগমের আকুতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই কেবল পারেন তার বাহিনীকে নির্দেশ দিয়ে আমার সন্তানের নিখোঁজের রহস্যটি বের করতে।

এদিকে তদন্তকারী পরিদর্শক সুলতান আহমেদ জানান, আমরা মামলাটির ফাইনাল রিপোর্ট গত মাসে দিয়ে দিয়েছি। অপহরণ, গুম কিংবা নিখোঁজের বিষয়ে কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

%d bloggers like this: