শেষ সকাল

নুর হোসেন শাহেদ : অনেকদিন পর গ্রামের বাড়ি গেছেন। যেখানে আপনার থাকা হয় কম, কিন্ত ভাবনায় জুড়ে থাকে অষ্টপ্রহর। শহরের কোলাহল, মেকি মেকি জীবন, ব্যস্ত দৌড়ঝাঁপে ক্লান্ত মনের একটাই জানালা_ এই গ্রাম; যাকে ভেবে ভেবে আপনি ভালো থাকেন। কত কতবার ফিরতে চান এখানে, কিন্তু সময়টা হয়ে উঠেনা। আর অনেক অনেক দিন পর যেই মিলে সেই সময়, ক’টা দিনের নিরালা দুপুর, দীঘির জলে পূর্ণিমা রাত আর শিশির ভেজা সকাল, কি করে যে এত দ্রুত ফুরিয়ে যায় তা; আপনি টেরই পান না।

আজ অনেক ভোরে উঠেছেন। আজ এখানে শেষ সকাল; তাই। হাঁটছেন বাড়ির চারপাশটা। ক্ষেতের আলে ভোরের শিশির দু’পায়ে লেপ্টে যাচ্ছে ঝরাপাতা আর শুকনো মাটি সমেত। মনটা হু হু করে উঠে কতদিন আবার আর এই দৃশ্য দেখতে পাবোনা! খেজুরের গাছে একটা পাখি রস চুরি করে খাচ্ছে। আপনার একবারও মনে হলো না এই দৃশ্য ফটোগ্রাফিতে বাঁধি। মন চাইলো শুধু মন ভরে চেয়ে থাকতে। সোঁদা মাটির গন্ধে এই দৃশ্যে যে সুখে অন্তর ভরে যায়, ফটোগ্রাফি সেই সুখ দিতে পারে না। এটা একান্ত নিজস্ব, অন্তরের ভোগ।

হাঁটতে হাঁটতে পুকুর পাড় পেরিয়ে, ক্ষেতের আল মাড়িয়ে, বড় রাস্তা ছাড়িয়ে আপনি প্রায় নদীর কূলে পৌঁছে গেছেন। এত ভোরে এত হাওয়া এখানে মনটা নির্ভার হয়ে যায়। দূরে কয়েকটা মহিষ চড়ে বেড়াচ্ছে। তার পিঠে নাম না জানা পাখিরা দুটি ডানা ঝিরোতে দিয়ে অলস বসে আছে। বেশ ক’টা নৌকো ডাঙ্গায় বসে রোদ পোহাচ্ছে। ধানের ক্ষেতে হাওয়ারা বিলি কেটে ছুটছে তেপান্তরের দিকে। আপনার চোখ ভরে জল চলে আসে। কতদিন আর এই দৃশ্যে নয়ন জুড়াবেনা! কতদিন, কত কতদিন আবার দেখা হবে না এই মাটি, ধূলিপথ, খড়কুটোর বৈভব!

একটা আফসোস্ হঠাৎই বুকের বা’পাশটাই চাকু চালায়। আজই কেন এলাম এখানে, এই শেষদিনে! কেন গতকালও এলাম না, কেন ঘুম ভাঙলোনা পরশু ভোরেও! ক’টা দিন কিভাবে কেটে আজ শেষদিন চলে এলো! শেষদিনের শেষদেখায় কেন এতো মায়া? শেষের মাঝে এই অশেষ মোহ কেন মনটাকে এতো কাতর করে!

বড় রাস্তা ছেড়ে এবার মটরশুঁটির ক্ষেত হয়ে আপনি বাড়ির পথে। আজ ফিরে যাবেন শহরে। আজ শেষ সকাল এখানে। ভুলগুলো শুধরে আপনি তাই যথাসম্ভব চোখে ও চেখে ফিরছেন গ্রাম। বুক ভরে নিচ্ছেন শ্বাস। পা টনটনে ব্যথায়ও ঘুরপথে ফিরছেন বাড়ি। যদ্দুর সম্ভব দৃষ্টিতে ভরে নিচ্ছেন আগামীদিনের খোরাক। আজ শেষদিন এখানে, আজ মন বড় দূর্বল।

জীবনের শেষদিন কি তবু বলে কয়ে আসে? শেষ সকাল? তবে শেষ সালাত ভেবে কবে ফজরে জেগেছেন? কবে শেষ হয়ে যাওয়ার ভয়ে নি:শেষ সঁপেছেন নিজেকে আত্মসমর্পণে, নতজানু-মাথানত হয়ে বিচারদিনের রবের কাছে?

লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

%d bloggers like this: