মনের হিজাব লুট হয়ে যায়; অত:পর চরাচরে নগ্নতাই দৃশ্য আর নিরুপায় স্রোতে ভাসে অক্ষম পিপীলিকা

নুর হোসেন শাহেদ : একটা সময় আপনার ‘মন’ ভেতর ঘরেরই বাসিন্দা ছিল। খুব একটা দেখা মিলতো না তার। যেখানে আপনি স্বশরীরে যেতেন মনও সাথে যেত। তারপর কুশলে, আড্ডাতে বেড়িয়ে আসতো ভেতর ঘর থেকে। আর বিশেষ জনের ক্ষেত্রে চিঠিতে উজাড় হতো মন। কদাচিৎ পত্রমিতালীতে অচেনার জন্যও খুলেছে সেই দুয়ার। ব্যস এইটুকুই। সেই হিসেবে মনেরও একটা হিজাব পরিবেশ-পারিপার্শ্বিকতায় জারি ছিল এই কিছুকাল আগেও। আজ নেই।

আপনি যদি ৮০ কি ৯০ এর কিশোর কিংবা কিশোরী হন, তাহলে আরেকবার সেখানে ফিরে যান। ভাবুন, আপনাদের বাসার সেই বাউন্ডারি ওয়ালটার কথা। ওটা আপনার খুব প্রিয়। কারণ সারাদিন আপনার মনে যখন যা আসে আপনি দৌঁড়ে গিয়ে তা ওখানে লিখে আসেন। বোনের বিয়ের ছবিগুলোর ফ্লিম ডেভেলপ করার পর সেই ওয়ালে স্কচটেপ দিয়ে সেঁটে আসেন, কিংবা আজ দুপুরে কি রান্না করলেন তারও ছবি তুলে আপনি হন্তদন্ত ছুটছেন বাসার বাইরের ওয়ালটাতে ঝুলিয়ে দিতে। তারপর পাড়ার পরিচিত-অপরিচিত, ছোট-বড় সবাই আপনার বাসার পাশ দিয়ে যেতে যেতে বোনের, মায়ের, খালার ছবি দেখবে, মনের গোপন কথা গুলো পড়বে আর খাওয়ার ছবির নিচে লিখে যাবে ‘দাওয়াত তো পেলাম না?’

আপনি হয়তো বলবেন, ‘আমরা অত অসভ্য ছিলাম না কখনো। ঘরকে উজাড় করে অমন বাইরে ঠেলে দিইনি কোন কালে।’ জ্বী, শতভাগ সত্য আপনার কথা। আপনাদের সেই সময়ে, সেই ৮০তে, ৯০এ ব্যক্তিগত কথাগুলো প্রকাশ্যে দেয়ালে লিখাকে অসভ্যতা হিসেবেই গন্য করা হতো। তাও যারা লিখতো; পাবলিক টয়লেটের ওয়ালে লুকিয়ে-ছাপিয়ে লিখতো! কিন্তু আজ আপনি নিজেই যে ‘ফেইসবুক ওয়াল’ নামক ওয়ালে মনের সবকথা লিখে যাচ্ছেন অকপট, নিজের আর ঘরের মানুষের সব ছবি ঝুলিয়ে যাচ্ছেন দিনরাত, তা কি একবারও ভেবেছেন অসভ্যতা হচ্ছে কিনা?’ – ‘থামেন, হুজুর! গোটা পাড়াই আমার ফ্রেন্ডলিস্টে আপনারে কে বললো? আপনি তো দেখি পুরাই কাশেম বিন আবু বকর, দ্বীন ও সমাজ সংস্কারের নামে কল্পনায় ঘোড়া দৌড়াচ্ছেন সমানে!’

‘তা একদিন ফ্রেন্ডলিস্টকে দাওয়াত করে দেখেন তো ড্রইংরুমে আঁটে কিনা! আর ফেইসবুকে সিকিউরিটি অপশানটাও একটু চেক করে দেখেন যে তাতে কুলুপ আঁটা আছে কিনা? নাকি ফ্রেন্ড হওয়ার আগেই প্রোফাইল ভচকে সব বেরিয়ে যাচ্ছে প্রায় দুইশো কোটি এফবি গ্রাহকের মোবাইলে, স্ক্রিনে?’
পরিচিত মাধ্যম হয়ে এক অপরিচিত বোনের কথা কানে এসেছিল। ছেলের স্কুলের ওয়েটিং রুমে বসে বসে তিনি বলছিলেন, ‘একটা সময় মানুষের ডায়েরী লেখার অভ্যাস ছিল এবং তা সতর্কতার সাথে গোপন রাখা হতো। একই অনুভূতি, ব্যক্তিগত ব্যাপার-স্যাপার মানুষ আজো লেখে, তবে তা ফেইসবুকে আর লাইক গুনে নিশ্চিত হতে চায় কতজনে সেটা পড়লো!’

এভাবে মন বেপরোয়া হয়ে উঠছে দিন দিন, গ্লোবালাইজেসনের দোহাই দিয়ে বহুগামিতার বিকৃতিতে অজান্তে ধীরে ধীরে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে, বেপর্দার স্পর্ধা স্বাধীনতা, স্বকীয়তার খোলশে যায়েজ ধারণায় রুপ নিচ্ছে। আর গোঁফের নিচে মুচকি হাসি নিয়ে শয়তান সুখনিদ্রায় আছে। এখন তার কাজের চাপ কম। আপতত: ইন্টারনেটের গায়েবী এই ফিতনায় টাইমমেশিনে চেপে উম্মাহ দ্রুত পৌঁছে যাবে একদিন লূত (আ:) এর জাতির কাছে। শয়তান ঘুমালেও তাতে তার কর্মে ব্যাঘাত ঘটার আশংকা সে করে না নিশ্চয়!

লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

%d bloggers like this: