বাংলাদেশের ‘বনসু’ থেকে বিশ্বখ্যাত হুগো বস

বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন:  ‘বনসু বাংলাদেশ লিমিটেড’ চট্টগ্রাম ইপিজেডের একটি প্রতিষ্ঠান। বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড ‘হুগো বস’ এই প্রতিষ্ঠানের একমাত্র ক্রেতা। ‘বনসু’ থেকে জুতা কিনে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ লিখে ‘হুগো বস’ সমগ্র বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছে, বাংলাদেশের পণ্য কতটা মানসম্মত।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দু’জন বিদেশি মিলে গড়ে তুলেছেন বনসু বাংলাদেশ লিমিটেড। এই দু’জন তাইওয়ানের নাগরিক। একজন লি চেঙ্গ টা (ভিক্টর লিন), অন্যজন হো চিন হাঙ্গ। তাদের প্রতিষ্ঠানে প্রতিমাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার জোড়া জুতা তৈরি হয়। সব জুতাই হুগো বস কিনে নেয়। এই জুতা ‘হুগো বস’ সরাসরি জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় নিয়ে যায়। এছাড়া সুইজারল্যান্ডের ওয়্যারহাউসের মাধ্যমে চাহিদা অনুযায়ী ইউরোপের অন্যান্য দেশেও এই রফতানি করা হয়। এভাবেই প্রতিষ্ঠানটির তৈরি জুতা বাংলাদেশের সুনাম বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিয়েছে।

এ বিষয়ে কোনও কথা বলতে রাজি হননি বনসু কোম্পানির কোনও কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মালিকদের অনুমতি ছাড়া গণমাধ্যমে কথা বলতে নিষেধ আছে। আর দুই মালিকই রয়েছেন দেশের বাইরে।’

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম ইপিজেডের মহাব্যবস্থাপক মো. খোরশেদ আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বনসু বিশ্ববিখ্যাত ব্রান্ড হুগো বস ও আরমানিসহ বিভিন্ন ব্রান্ডের জুতা উৎপাদন ও রফতানি করে। উন্নতমানের জুতা উৎপাদনের জন্য প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে বিশ্ববাজারে ব্যাপক খ্যাতি পেয়েছে। বর্তমানে এ কোম্পানিতে এক হাজার ৫০০ দেশি লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। তাদের মধ্যে বড় অংশ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও ৫০ শতাংশের বেশি নারীকর্মী।’

বনসু শতভাগ কমপ্লায়েন্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠান উল্লেখ করে খোরশেদ আলম আরও বলেন, ‘বিশ্ববিখ্যাত ব্রান্ডের পণ্য উৎপাদন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও রফতানি আয়ের মাধ্যমে বনসু দেশের জন্য সুনাম বয়ে আনছে। এছাড়া দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখছে প্রতিষ্ঠানটি।’

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেপজা)-এর মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) নাজমা বিনতে আলমগীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পোশাক প্রস্তুতকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সুনাম বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। এখন বাংলাদেশ শুধু একটি পোশাক প্রস্তুতকারী দেশই নয়, ইপিজেডে প্রস্তুত করা বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের অন্যান্য পণ্যের জন্য বিখ্যাত। চট্টগ্রাম ইপিজেডের প্রতিষ্ঠান বনসুর তৈরি হুগো বস জুতা বাংলাদেশের পরিচিতি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিচ্ছে। একইসঙ্গে দেশের শ্রমিকদের কর্মদক্ষতার সুখ্যাতি প্রসারিত হচ্ছে।’

এর আগে বিশ্ববিখ্যাত ব্র্যান্ড হুগো বসের জুতায় ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ লেখা দেখে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। প্রতিমন্ত্রী তার ফেসবুকে লিখেছেন, ‘বাংলাদেশ পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক তৈরি ও রফতানিকারক দেশ, এটা পুরনো খবর। জাহাজ রফতানি করে, এটিও পুরনো খবর। যুক্তরাষ্ট্রে ওষুধ রফতানি করে, এটিও পুরনো খবর। কিন্তু আমি নিজের চোখে যা দেখলাম আজ, আনন্দে ঘুম হারাম হয়ে গেলো। বিশ্ববিখ্যাত ব্র্যান্ড ‘হুগো বস’-এর দোকানে বিক্রি হচ্ছে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ জুতা। তাও আবার কোনও নিয়মিত পণ্য বা টাইপ নয়, লিমিটেড এডিশনের AMZ Mercedes Benz রেঞ্জের জুতা।’’

প্রসঙ্গত, রফতানিমুখী চামড়াজাত পণ্য ও জুতা রফতানিকারকদের সংগঠন লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এলএফএমইএবি) ও বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যসহ সারাদেশে গড়ে উঠেছে এক হাজারেরও বেশি প্রতিষ্ঠান। তবে বনসু এই বড় দু’টি সংগঠনেরই একটিরও সদস্য নয়।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাংলাদেশের তৈরি জুতা বিশ্ববিখ্যাত ব্র্যান্ড হুগো বস নেয়। শুধু তাই নয়, এর চেয়েও ভালো ব্র্যান্ডের কোম্পানিও বাংলাদেশ থেকে জুতা কিনছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইউরোপের সবচেয়ে বড় জুতা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ডাইচম্যান। এই প্রতিষ্ঠানটিতেও যাচ্ছে বাংলাদেশের তৈরি জুতা। এছাড়া দেশে তৈরি জুতা বিশ্বখ্যাত প্রাডা, তামারিজ ও এস্প্রিট, বিডটজেডডট মোডা, হিউম্যানিক, রিগ্যাল, ইউএস পোলো, গালুস, এইচঅ্যান্ডএম ও নোভি, ক্লার্কস, ডেকারস, ইকো, রকপোর্ট, টিম্বারল্যান্ড, উলভারাইন, কোল হান, গেস, জোনস গ্রুপ, মাইকেল কোরস, ব্যালি, কেনজো, মিউ মিউ, পল স্মিথ নিয়ে নিজেদের ব্র্যান্ডের নামে বিক্রি করছে।’

জানা গেছে, বাংলাদেশের জুতা রফতানির প্রায় ৬৫ শতাংশই ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে যায়। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) জুতা রফতানি বেড়েছে ১৩ দশমিক ১৩ শতাংশ।

উল্লেখ্য, হুগো বস হচ্ছে বিশ্বের নামিদামি ১০টি ব্র্যান্ডের অন্যতম জুতা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান। আগে জার্মানিভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠানটি পোশাক বিক্রি করলেও সম্প্রতি জুতা বাজারজাত করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

%d bloggers like this: