‘অনেক মেয়েকে আমরা এভাবে ব্ল্যাকমেইল করেছি, তারা আমাদের কথামতো চলে’

ডেস্ক: একবার নয়, বারবার ধর্ষণের জন্যই সে দৃশ্যের ভিডিও চিত্র ধারণ করে ব্ল্যাকমেইলের চেষ্টা করা হয়েছে বলে দাবি দুই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীর। সাফাত আহমেদ ও নাঈম আশরাফের ব্ল্যাকমেইল ও ভয়-ভীতির একপর্যায়ে তা ফাঁস করে দিয়ে মামলা করতে বাধ্য হয়েছেন বলেও জানিয়েছেন দু’ভিকটিম। মামলার অপর তিন আসামি ওই দু’ছাত্রীর বন্ধু সাদমান সাকিফ এবং সাফাতের গাড়ি চালক বিল্লাল হোসেন ও বডিগার্ড। ধর্ষণের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় গতকাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাপসাতালে গঠন করা হয়েছে ৫ সদস্যের এক মেডিকেল টিম। একই দিন দু’তরুণীর ফরেনসিক টেস্টও সম্পন্ন হয় হাসপাতালটির ফরেনসিক বিভাগে। তবে এ পর্যন্ত কেউ গ্রেপ্তার হয়নি।

জানা যায়, গত ২৮শে মার্চ দিবাগত রাতে ওই ঘটনার এক মাসের বেশি সময় পর গত বুধবার ওই দু’তরুণী বনানী থানায় গিয়ে ধর্ষণের অভিযোগ জানায়। পরদিন জমা দেন লিখিত অভিযোগ। নানা গড়িমসির পর অভিযোগ জানানোর তৃতীয় দিন গত শনিবার রাতে এসে দায়ের হলো মামলাটি। মামলার প্রধান আসামি সাফাত প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদের ছেলে হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে মামলা না নিতে প্রভাব খাটানোর অভিযোগও উঠেছে। রোববার পুলিশ দুই তরুণীকে ঢাকা মেডিকলে কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। ওই হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগে পাঁচ সদস্যের একটি টিম গঠন করা হয়। টিমের প্রধান ওই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদ। একই দিন সম্পন্ন হয় তাদের তিনটি পরীক্ষা। তা হচ্ছে মাইক্রোবায়োলজি, রেডিওলজি, ডিএনএ টেস্ট। আগামী ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে রিপোর্ট দেয়ার কথা রয়েছে।

মামলার এজাহার ও বাদীর জবানিতে জানা যায়, ওই দুই তরুণী পৃথক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। দু’জনই সম্মান শেষ বর্ষে অধ্যয়নরত। বাসা নিকেতনে। দু’বছর আগে পরিচয়ের পর থেকে সাদনান সাকিফ নামে একজনের সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্ব হয়। মাঝে মাঝে তার সঙ্গে যোগাযোগ হতো। গত ২৮শে মার্চের ঘটনার ১০ থেকে ১৫ দিন আগে দেখা হলে সে তার বড় ভাই পরিচয় দিয়ে সাফাত আহমেদের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয়। ওই দিনই সাফাত আহমেদ আমাদেরকে তার জন্মদিনের পার্টিতে দাওয়াত দেন। বলেন, অবশ্যই যেতে হবে। আমরা তখন কথা দিই নি। এরপর দু-একবার সাকিফের সঙ্গে দেখাও হয়। আর জন্মদিনের আগে সাকিফ বারবার পার্টিতে যেতে বলে। সাফাতও মোবাইলে দাওয়াত রক্ষা করার জন্য জোর করতে থাকে। অবশেষে গত ২৮শে মার্চ সন্ধ্যায় নিকেতনের বাসায় সাফাত তার গাড়ি চালক বিল্লাল ও তার বডিগার্ডসহ গাড়ি পাঠিয়ে দেয়। রাত ৯টার দিকে হোটেলে পৌঁছি। কিন্তু সেখানে গিয়ে আমাদের ধারণা পাল্টে যায়। আগে আমাদের ধারণা ছিল যে হোটেলে পার্টি হবে। অনেক লোকজন উপস্থিত থাকবে। অনুষ্ঠান হবে হোটেলের ছাদে। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর কোন ভদ্র লোকজন দেখিনি। সাফাত, নাঈম, সাকিফ ছাড়া আরো দুই মেয়েকে দেখি। সাফাত ও নাঈমকে বারবার মেয়ে দু-টোকে সঙ্গে করে নিচে নামতে দেখি। ওই সময় আমাদের আরো এক ছেলে ও মেয়ে বন্ধু এক সঙ্গে সেখানে যায়। কিছুক্ষণ পর সেখানে আমাদের আর ভালো না লাগায় আমরা চলে যেতে উদ্ধত হই। তখন তারা বাধা দেয়। একপর্যায়ে পরে বান্ধবী নিয়ে আসা আমাদের অপর ছেলে বন্ধুকে মেরে তার প্রাইভেট কারের চাবি ছিনিয়ে নেয়। তারা তাকে খুব মারধর করে। এরপর সাফাত ও তার বডিগার্ড আমাদেরকে অস্ত্র ঠেকিয়ে নিচে হোটেলের কক্ষে নিয়ে যায়। একপর্যায়ে সাফাত আমাকে নেশা জাতীয় দ্রব্য খাইয়ে দেয়। ধর্ষণ করে। আর ড্রাইভারকে তখন তা ভিডিও করতে বলে। সে তাই করে। নাঈম ধর্ষণ করে অপর বান্ধবীকে। সাফাত আমাকে মারধরও করেছে। তখন প্রতিবাদ করলে হুমকি দেয়। ব্ল্যাকমেইল করে। যখন ডাকবে তখন আসতে বলে।

তার কথা মতো তাকে পরে ব্ল্যাকমেইলও করতে দেখা যায়। আমার তথ্য সংগ্রহের জন্য তার বডিগার্ডকে আমাদের বাসায় পাঠায় তথ্য সংগ্রহ করার জন্য। আমি তাতে ভয় পাই। পরে লোক লজ্জার ভয় কাটিয়ে আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে মামলা করি। এজন্য মামলা করতে বিলম্ব হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

মামলার বাদী মানবজমিনকে বলেন, ধর্ষণের সময় আমি প্রতিবাদ করি। এসব কথা তার বাবাকে ও পুলিশকে বলে দেব বলি। তাতে সে উল্টো আমাকে হুমকি দেয়। বলে, র‌্যাব-পুলিশকে বলতে যাসনে। হারিয়ে যাবি। গুম হয়ে যাবি। আর পৃথিবী দেখবি না। অনেক মেয়ে হারিয়ে গেছে। অনেক মেয়েকে আমরা এভাবে ব্ল্যাকমেইল করেছি। তারা আমাদের কথামতো চলে। ধারণ করা ভিডিও দেখিয়ে বলে যখন ডাক দেব তখন আসবি। কোন চালাকি করবি না। কথা মতো ওই ভিডিও প্রকাশ করে দেয়ার হুমকি দিচ্ছিল। ঢাকার বাসা ও গ্রামের বাড়িতে লোক পাঠিয়ে তথ্য সংগ্রহ করছিল।

মামলার তদন্তের দায়িত্ব পাওয়া বনানী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ আব্দুল মতিন বলেন, ঘটনাস্থলে তাদের উপস্থিতির সত্যতা পেয়েছি। ফরেনসিক রিপোর্ট পাওয়ার পর জানা যাবে তারা ধর্ষিতা হয়েছেন কিনা? এদিকে মামলার আসামি সাফাত ও নাঈমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদেরকে পাওয়া যায়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

%d bloggers like this: