মিরসরাইয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাত্রীবাহী বাস ২০০ ফুট গভীর খাদে পড়ে নিহত ৮, আহত ২৫, পৃথক দুর্ঘটনায় নিহত ২

এম আনোয়ার হোসেন, মিরসরাই সংবাদদাতা : মিরসরাইয়ে একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ২০০ ফুট গভীর পাহাড়ের নিচে খাদে পড়ে ৮ জন নিহত ও অন্তত ২৫ জন আহত হয়েছে। সোমবার (২৯ মে) দুপুর দেড়টার সময় বারইয়ারহাট-খাগড়াছড়ি সড়কের ভবানী লোহারপুল এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। জোরারগঞ্জ থানা পুলিশ, মিরসরাই ফায়ার সার্ভিসও সিভিল ডিফেন্স কর্মী, স্থানীয় লোকজন আহতদের উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠায় এবং নিহতদের লাশ উদ্ধার করে। এছাড়াও পৃথক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে আরো ২ জন।

নিহতরা হলো পটিয়া উপজেলার ছনহরা গ্রামের মৃত আহম্মদ কবিরের পুত্র এবং ফটিকছড়ি উপজেলার আন্ধারমানিক বন বিট কর্মকর্তা আবু তালেব খাঁন (৫০), মিরসরাইয়ের কয়লা বাজার এলাকার নুর নবী (১৮), বাসের চালক ইব্রাহীম (৪৫), ভুজপুরের হেঁয়াকোবাজার এলাকার আব্দুল বারেকের পুত্র আলী আশরাফ (৪০), খাগড়াছড়ি জেলার তাইন্দং ইউনিয়নের বাজারটিলা গ্রামের মোনাফ সওদাগরের স্ত্রী রহিমা বেগম (৫৫), করেরহাট ইউনিয়নের ছত্তরুয়া গ্রামের ফরেষ্ট এলাকায় নুরুল ইসলাম প্রকাশ ইসমাইল (৫০), খাগড়াছড়ির রামগড় সম্প্রপাড়া গ্রামের রবিউল হকের পুত্র নুরুল হক (২৫)। এছাড়াও অজ্ঞাত একজন পুরুষ (৪০) চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে। আহতদের বারইয়ারহাট কমফোর্ট হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনষ্টিক সেন্টার, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স মস্তানরগর হাসপাতাল ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

আহতরা হলো নোয়াখালী জেলার চৌমুহনী উপজেলার মৃত আবু তাহেরের পুত্র জহিরুল হক (৩২), ফটিকছড়ি উপজেলার ভাঙ্গা টাওয়ার রহমতপুর এলাকার শহীদ উল্ল্যাহর পুত্র ইউসুফ (৭৫), ফেনীর এলাহীগঞ্জ এলাকার মফিজ মিয়ার পুত্র নজরুল ইসলাম (১৮), মিরসরাইয়ের করেরহাট কয়লা এলাকার খোরশেদ আলমের পুত্র মুছা (৩৮), কুমিল্লা জেলার কচুয়া উপজেলার পালংকাছা শফিয়াবাদ এলাকার শহীদ উদ্দিনের পুত্র নাছির উদ্দিন (৩৯), কুমিল্লা জেলার চান্দিনা উপজেলার গিয়াস উদ্দিনের ছেলে শাহাদাত হোসেন (১২), সোহেলের ছেলে মোহাম্মদ সোহাগ (৯), অজ্ঞাত পুরুষ (২২), আমীর আলীর ছেলে রমিজ উদ্দিন (৭০), সীতাকুন্ড উপজেলার বাঁশবাড়ীয়া এলাকার শহীদ আহমদের ছেলে রাজু আহমেদ (৩৫), অজ্ঞাত পুরুষ (৪০), ফেনীর ফুলগাজীর বেলাল হোসেন (৩২), সামছুদ্দীন (৩৭), নোয়াখালী এলাকার জহির উদ্দিন (৩৫)। আহত অন্যদের নামও পরিচয় পাওয়া যায়নি।

পুলিশ জানায়, যাত্রীবাহী বাসটি ফেনী থেকে ওই এলাকার পাহাড়ি সড়ক ধরে খাগড়াছড়ি যাচ্ছিল। পথে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রায় ২০০ ফুট নিচে গভীর খাদে পড়ে যায়। এসময় ঘটনাস্থলেই মারা যান ৫ জন। স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় গুরুতর আহত অবস্থায় আরও অন্তত ২৫ জনকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ফেনী থেকে ছেড়ে আসা আলীফ সুপার বাসটি সড়কের নয়টিলা মাজার অতিক্রম করে লোহারপুল এলাকায় একটি বাঁক নেয়ার সময় অপর দিক থেকে আসা শান্তি পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাসকে সাইড দিতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পাহাড়ের নিচে পড়ে যায়। পরে স্থানীয় লোকজন বাসে রশি বেঁধে নিচে গিয়ে আহতদের উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠায়।

ঘটনার প্রতক্ষ্যদর্শী রুবেল হোসেন জানান, দুপুর দেড়টার সময় যাত্রীবাহী বাসটি দ্রুতও বেপরোয়া গতিতে আসার কারনে সড়কে ঝুঁকিপূর্ণ মোড় ঘুরার সময় নিয়ন্ত্রন হারিয়ে গভীর পাহাড়ি খাদে পড়ে যায়। এসময় আমরা স্থানীয় লোকজন ওই খাদে নেমে আহতদের উদ্ধার তৎপরতা শুরু করি। কিন্তু এত গভীরে নেমে তাৎক্ষনিকভাকে সেখান থেকে আহতদের উদ্ধার করার বেশ কঠিন বিষয় ছিলো। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ও পুলিশ এসে আমাদের সাথে যোগ দেওয়ার পর আহত ও নিহতদের সেখানে উদ্ধার করা হয়।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার সাবরিনা ইসলাম বলেন, শাহাদাৎ (১২), সোহেলের ছেলে সোহাগ (৯), অজ্ঞাত পুরুষ (২২), আমীর আলীর ছেলে রমিজ (৭০), সীতাকুন্ড উপজেলার বাঁশবাড়ীয়া এলাকার শহীদ আহমদের ছেলে রাজু আহমেদ (৩৫), অজ্ঞাত পুরুষ (৪০) কে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (চমেক) পাঠানো হয়েছে।

মিরসরাই ফায়ার সার্ভিসও সিভিল ডিফেন্সের লিডার আবু মোঃ শরিফ বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে বাস চাপা পড়া ২ জনের লাশ উদ্ধার করি। আমরা যাওয়ার পূর্বে স্থানীয়রা আহতদের উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করায়। যাত্রীবাহী বাসটি সড়ক থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ২০০ ফুট নীচে পড়ে যায়।

জোরারগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক বিপুল দেবনাথ জানান, উপজেলার ১ নম্বর করেরহাট ইউনিয়নের বারইয়ারহাট-খাগড়াছড়ি সড়কের ভবানী লোহারপুল নামক এলাকায় খাগড়াছড়িগামী আলিফ সুপার (নং ঢাকা-মেট্রো-৯৬১৮) নামের একটি যাত্রিবাহী বাস নিয়ন্ত্রন হারিয়ে রাস্তা থেকে ২০০ ফুট গভীর পাহাড়ি খাদে পড়ে যায়। এসময় গাড়িতে প্রায় ৩৫-৪০ জন যাত্রী ছিলো। তারমধ্যে ঘটনাস্থলেই ৫ নিহত হয় এবং গুরুতর আহত হয় আরো প্রায় ২৫ জন। আহতদের স্থানীয় লোকজন ও ফায়ার সর্ভিসের সহায়তায় উদ্ধার করে স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। নিহতদের আত্মীয়স্বজনরা কোন মামলা না করলে আইনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিহদের লাশ স্বজদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। আহত ব্যক্তিদের অবস্থা গুরুতর। নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

জোরারাগঞ্জ থানার ওসি জাহিদুল কবির জানান, চালক নিয়ন্ত্রণ হারালে বাসটির ২০০ ফুটের মতো খাদের নিচে পড়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই ৫ জন মারা যায়। আহত অন্তত ২৫ জনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।

এদিকে উপজেলার বারইয়ারহাট-খাগড়াছড়ি সড়কের হিঙ্গুলী ইউনিয়নের তালতলা এলাকায় পিকআপের ধাক্কায় সাইদুল ইসলাম রানা (১৮) নামের এক যুবক নিহত হয়। সে হিঙ্গুলী ইউনিয়নের আজমনগর গ্রামের সফর আলী মাঝি বাড়ির নবী ড্রাইভারের পুত্র। এছাড়াও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বড় দারোগারহাটের উত্তর পার্শ্বে বেপরোয়া গতির গাড়ির ধাক্কায় অজ্ঞাত পুরুষ (৩৫) নিহত হয়। নিহতের লাশ উদ্ধার করে জোরারগঞ্জ হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ি চমেক মর্গে প্রেরণ করেছে। জোরারগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ শফিকুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

%d bloggers like this: